• রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

প্রকৃত বিপ্লবের জন্য প্রয়োজন মাওবাদ : মতাদর্শ ও রাজনীতি

প্রকৃত বিপ্লবের জন্য প্রয়োজন মাওবাদ : মতাদর্শ ও রাজনীতি

  আন্দোলন প্রতিবেদন  

শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬  |  অনলাইন সংস্করণ

২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর বহু পক্ষ থেকে বিপ্লবের কথা শোনা যাচ্ছে। ইউনূস থেকে জামাত, ছাত্র-নেতা থেকে বিএনপি– অনেকেই একে একটি বিপ্লব বলে আখ্যায়িত করেছে ও করছে। একটু যারা শেয়ানা, তারা বলছে বিপ্লবটা পুরো হয়নি, কিছুটা হয়েছে, এখন সেটা পূর্ণ করতে হবে। কেউবা দুই কূল রক্ষা করে বলছে, বিপ্লব একটা হয়েছে বটে, তবে তাতে মুক্তি হচ্ছে না, আরেকটা বিপ্লব করতে হবে।

এর মানে হচ্ছে, বিপ্লবের প্রয়োজনকে প্রায় সবাই স্বীকার করছে। এটা প্রকাশ করে যে, আমাদের সমাজের বিদ্যমান অবস্থার পরিবর্তন একটা প্রয়োজনে পরিণত হয়েছে এবং তাই বিপ্লবের একটা চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। তাই, সবাই বিপ্লবের নামে জয়গান গাচ্ছে। কেউ বলছে বিপ্লব হয়ে গেছে, কেউবা আরেকটি বিপ্লবের কথা বলছে, আর কেউ প্রচার দিচ্ছে বিপ্লবটা মাঝপথে কেউ হাইজ্যাক করে নিয়েছে। সবাই বিপ্লবী, কিন্তু বিপ্লবটা হয়নি বা হচ্ছে না।

বিপ্লব মানে কী? তা হলো বিদ্যমান ব্যবস্থাটির সবল উচ্ছেদ। এবং তার জায়গায় জনগণের স্বার্থ-উপযোগী নতুন এক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।

আমাদের দেশে বিগত কয়েক দশকে বেশ কয়েকটি অভ্যুত্থান ঘটেছে যখন বিদ্যমান শাসক গোষ্ঠীকে জনগণ তাদের বীরত্বপূর্ণ আন্দোলন দ্বারা উচ্ছেদ করেছেন। এর মাঝে ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ’৭৫-এর সিপাহী অভ্যুত্থান, ’৯০ এর গণ-অভ্যুত্থান এবং ’২৪’র গণ-অভ্যুত্থান– এগুলো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সবাই দেখছেন যে, জনগণের জীবনে এবং সমাজ-ব্যবস্থায় তেমন কোনো মৌলিক পরিবর্তন ঘটেনি। বিপ্লবী পরিবর্তন তো দূরের কথা। ক্ষমতাসীন অত্যাচারী গণবিরোধী সরকারটি উচ্ছেদ হলেও জনগণের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

এর মূল কারণ না খুঁজে শুধু হা-হুতাশ করে বা বিভিন্ন জনকে দায়ী করে কোনো সঠিক পথ পাওয়া যাবে না।

প্রশ্ন হলো, এদেশে বার বার গণ-অভ্যুত্থান হলেও কেন বিপ্লব হয়নি? এর প্রধান কারণ হলো– বিপ্লবী পরিবর্তনের জন্য যে বিপ্লবী কর্মসূচি প্রয়োজন তা কখনই নেতৃত্বে আসতে পারেনি। তা না পারার জন্য বিপ্লবী রাজনীতির দুর্বলতা ছিল ও রয়েছে এটা ঠিক। কিন্তু যা বেশি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরতে হবে তাহলো, বিদ্যমান রাষ্ট্র-ব্যবস্থা ও তার মালিক যে শাসকশ্রেণি তাকে উচ্ছেদ করার কোনো কর্মসূচি নেতৃত্বে আসেনি, বরং জনগণের আন্দোলন-অভ্যুত্থানের সুযোগ নিয়ে শাসকশ্রেণিরই ভিন্ন গোষ্ঠীগুলো ক্ষমতা দখল করেছে। এজন্য তারা ষড়যন্ত্র করেছে, জনগণের সাথে বিপ্লবের নামে প্রতারণা করেছে।

বিপ্লবী কর্মসূচি আসতে হলে তার একটি আদর্শ প্রয়োজন। বিপ্লবের আদর্শ ও বিজ্ঞান হলো মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ। এই মতাদর্শের দ্বারা সজ্জিত না থাকায় জনগণের বহুবিধ সংগ্রামের নেতৃত্ব চলে গিয়েছে সাম্রাজ্যবাদের দালাল বড় বুর্জোয়াদের বিভিন্ন গোষ্ঠীর হাতে। তাদের কেউ ’৭১-এর চেতনার কথা বলে ভারতের দালালী করেছে (হাসিনা-আওয়ামী লীগ), কেউবা মধ্যপন্থি উদারনৈতিকতার নামে পশ্চিমা ধরনের প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়া রাজনীতি ফেরি  করছে (বর্তমানের বিএনপি বা এনসিপি), আর কেউবা ধর্মের নামে প্রকাশ্য ফ্যাসিবাদের কথা বলছে (জামাতসহ ধর্মবাদী দল)।  

বিপ্লবী পরিবর্তন বলতে বুঝায় সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভর আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন। মাওবাদের আদর্শ ও রাজনীতির মতে আমাদের মতো সাম্রাজ্যবাদের দ্বারা নিপীড়িত দেশে তাদের দালাল আমলা-মুৎসুদ্দি (বড়) বুর্জোয়া শাসকশ্রেণির রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য প্রথমে প্রয়োজন নয়াগণতান্ত্রিক/জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব। এই বিপ্লব বড় বড় বুর্জোয়া, সাম্রাজ্যবাদ, ভারত ও আধা-সামন্ততান্ত্রিক শ্রেণিকে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ করে প্রতিষ্ঠা করবে শ্রমিক, কৃষক, দরিদ্র, এবং নিপীড়িত নারী-আদিবাসী-জনগণের রাষ্ট্রক্ষমতা। যারা তাদের নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী সমগ্র দেশ ও সমাজকে বদলে দেয়ার কর্মযজ্ঞে সামিল হবে। যা শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত ও দেশপ্রেমিক ছোটো বুর্জোয়াশ্রেণির যৌথ বিপ্লবী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এই চার শ্রেণির যৌথ একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করবে। এরপর অব্যাহতভাবে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করা এবং সারা বিশ্ব জুড়ে কমিউনিজম ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিপ্লব এগিয়ে নেবে। সমাজতন্ত্র থেকে কমিউনিজমে যাবার পথে মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব চালিয়ে যেতে হবে। যাতে নতুন নতুন পুঁজিবাদীদের মতাদর্শ-রাজনীতিকে পরাজিত করতে হবে। বিশ্ব-ব্যাপী কমিউনিজম ব্যবস্থা হলো শ্রেণিহীন-শোষণহীন এক নতুন ধরনের সমাজব্যবস্থা। একমাত্র এ পথেই শুধু আমাদের দেশের নয়, সারা বিশ্বের নিপীড়িত জনগণের মুক্তি ঘটতে পারে। 

অতীতে রাশিয়া ও চীনে এই বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল। যদিও বিপ্লবের মাঝপথে নব্য পুঁজিবাদের দালালরা ক্ষমতা দখল করে চীন-রাশিয়ায় পুনরায় পুঁজিবাদ প্রতিষ্ঠা করেছে। এই বিপ্লব স্বতঃস্ফূর্তভাবে সংঘটিত হয়নি, হওয়া সম্ভবও নয়। মা-লে-মাবাদী আদর্শ অনুসারে এটি হয়েছে সর্বহারা শ্রেণির অগ্রসর অংশের নেতৃত্বে, সত্যিকার বিপ্লবী পার্টির নেতৃত্বে। 

 

আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা হচ্ছে নয়া-উপনিবেশিক আধা-সামন্ততান্ত্রিক। ছোট দেশ, সমতল ভূমি, ঘন বসতি, বিপুল জনসংখ্যা, অর্থনীতি ভাষা ও সংস্কৃতির প্রায় সমবিকাশ, এবং সর্বোপরি বিগত বহু দশকে আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় বহু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন– ইত্যাদি কারণে চীন বা রাশিয়ার মতো হুবহু মডেলে বিপ্লব হবে না। কিন্তু মা-লে-মাবাদী মতাদর্শ-রাজনীতির ভিত্তিতে শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে গ্রামাঞ্চলে কৃষকের দীর্ঘস্থায়ী বিপ্লবী সংগ্রামকে কেন্দ্রবিন্দু করেই সারাদেশ জুড়ে বিপ্লবী সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে। কারণ, কৃষকের সমস্যাই হলো এদেশে সবচেয়ে মৌলিক সমস্যা। যাকে কর্মসূচি আকারে তুলে ধরতে পারে শ্রমিক শ্রেণি, তার মতাদর্শ মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদের সাহায্যে। তাহলেই কৃষকের, শ্রমিকের, নিপীড়িত নারীর, আদিবাসীর ও সংগ্রামী ছাত্র-তরুণদের সত্যিকার মুক্তির কর্মসূচি সামনে আসবে। তার ফলে বুর্জোয়ারা, যারা সাম্রাজ্যবাদের দালাল, তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না নিজেদের প্রতারণামূলক কর্মসূচি চাপিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করা।

যারা মাওবাদকে স্বীকার করে না তারা মুখে শহরে গণ-অভ্যুত্থানের কথা বলে থাকে। কিন্তু কার্যত তারা বিগত পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে সে রকম কোনো অভ্যুত্থানের কোনো দৃষ্টান্ত দেখাতে পারেনি। বাস্তবে তার লক্ষ্যে তারা কোনো কাজও করেনি। বরং তারা বুর্জোয়া রাজনীতিরই লেজুড় হিসেবে কাজ করেছে। অবস্থাটা এমন হয়েছে যে, বিপ্লবী সংগ্রাম দূরের কথা, তারা এমনকি শ্রমিক-কৃষকের স্বার্থে সংস্কারমূলক সংগ্রামও তেমন একটা করছে না। এ থেকে দেখা যায় যে, তাদের তথাকথিত গণঅভ্যুত্থানের রাজনীতির মূল বিষয় হলো নিপীড়িত জনগণকে তাদের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের রাজনীতি থেকে দূরে রাখা। 

এর উৎস নিহিত রয়েছে তাদের মতাদর্শিক-রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে। যা কিনা সমাজতন্ত্রের আদর্শ ও রাজনীতির বিপ্লবী সারবস্তুকে ছাঁটাই করে দেয়। আমাদের দেশ কৃষিপ্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও গ্রামকে ও কৃষককে তারা গুরুত্ব দেয় না। কারণ, তারা মাওবাদকে ধারণ করে না, প্রকারান্তরে তাকে বিরোধিতা করে। তারা বিপ্লবের জন্য জনগণের দিক থেকে বলপ্রয়োগের ও জনগণের সশস্ত্র শক্তির প্রয়োজনীয়তাকে উপেক্ষা করে। এর মধ্য দিয়ে তারা জনগণকে বলহীন করে দেয়। ফলে আন্দোলন ও অভ্যুত্থানের ফল চলে যায় বুর্জোয়াদের হাতে, আর তারা নিজেরা বিপ্লবের বদলে সংস্কারের কানাগলিতে আটকা পড়ে। এদেশের সংসদীয় বামেরা এভাবেই বুর্জোয়াদের লেজুড়বৃত্তি করছে। 

তাই দেশের শ্রমিক-কৃষক-আদিবাসী-নারীসহ নিপীড়িত জাতি ও জনতাকে মাওবাদের আদর্শ-রাজনীতিকে ভিত্তি করেই গ্রামে-শহরে শ্রমিক-কৃষকের ব্যাপক বিপ্লবী কর্মসূচির ভিত্তিতে সংগঠিত হতে হবে। 

ছাত্র-তরুণদের আত্মপ্রতিষ্ঠার মোহ ত্যাগ করে শ্রমিক-কৃষকের সাথে একাত্ম ও বিপ্লবী মতাদর্শে সজ্জিত হয়ে বিপ্লব সম্পন্ন করার দিকে এগিয়ে আসতে হবে। অতীত ও ’২৪-এর অভ্যুত্থান পরবর্তী ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে ছাত্র-তরুণ-জনতাকে মাওবাদের লাল পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরেই সমাজ পরিবর্তনের বিপ্লবী সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

প্রকৃত বিপ্লবের জন্য প্রয়োজন মাওবাদ : মতাদর্শ ও রাজনীতি

 আন্দোলন প্রতিবেদন 
শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬  |  অনলাইন সংস্করণ

২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর বহু পক্ষ থেকে বিপ্লবের কথা শোনা যাচ্ছে। ইউনূস থেকে জামাত, ছাত্র-নেতা থেকে বিএনপি– অনেকেই একে একটি বিপ্লব বলে আখ্যায়িত করেছে ও করছে। একটু যারা শেয়ানা, তারা বলছে বিপ্লবটা পুরো হয়নি, কিছুটা হয়েছে, এখন সেটা পূর্ণ করতে হবে। কেউবা দুই কূল রক্ষা করে বলছে, বিপ্লব একটা হয়েছে বটে, তবে তাতে মুক্তি হচ্ছে না, আরেকটা বিপ্লব করতে হবে।

এর মানে হচ্ছে, বিপ্লবের প্রয়োজনকে প্রায় সবাই স্বীকার করছে। এটা প্রকাশ করে যে, আমাদের সমাজের বিদ্যমান অবস্থার পরিবর্তন একটা প্রয়োজনে পরিণত হয়েছে এবং তাই বিপ্লবের একটা চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। তাই, সবাই বিপ্লবের নামে জয়গান গাচ্ছে। কেউ বলছে বিপ্লব হয়ে গেছে, কেউবা আরেকটি বিপ্লবের কথা বলছে, আর কেউ প্রচার দিচ্ছে বিপ্লবটা মাঝপথে কেউ হাইজ্যাক করে নিয়েছে। সবাই বিপ্লবী, কিন্তু বিপ্লবটা হয়নি বা হচ্ছে না।

বিপ্লব মানে কী? তা হলো বিদ্যমান ব্যবস্থাটির সবল উচ্ছেদ। এবং তার জায়গায় জনগণের স্বার্থ-উপযোগী নতুন এক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।

আমাদের দেশে বিগত কয়েক দশকে বেশ কয়েকটি অভ্যুত্থান ঘটেছে যখন বিদ্যমান শাসক গোষ্ঠীকে জনগণ তাদের বীরত্বপূর্ণ আন্দোলন দ্বারা উচ্ছেদ করেছেন। এর মাঝে ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ’৭৫-এর সিপাহী অভ্যুত্থান, ’৯০ এর গণ-অভ্যুত্থান এবং ’২৪’র গণ-অভ্যুত্থান– এগুলো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সবাই দেখছেন যে, জনগণের জীবনে এবং সমাজ-ব্যবস্থায় তেমন কোনো মৌলিক পরিবর্তন ঘটেনি। বিপ্লবী পরিবর্তন তো দূরের কথা। ক্ষমতাসীন অত্যাচারী গণবিরোধী সরকারটি উচ্ছেদ হলেও জনগণের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

এর মূল কারণ না খুঁজে শুধু হা-হুতাশ করে বা বিভিন্ন জনকে দায়ী করে কোনো সঠিক পথ পাওয়া যাবে না।

প্রশ্ন হলো, এদেশে বার বার গণ-অভ্যুত্থান হলেও কেন বিপ্লব হয়নি? এর প্রধান কারণ হলো– বিপ্লবী পরিবর্তনের জন্য যে বিপ্লবী কর্মসূচি প্রয়োজন তা কখনই নেতৃত্বে আসতে পারেনি। তা না পারার জন্য বিপ্লবী রাজনীতির দুর্বলতা ছিল ও রয়েছে এটা ঠিক। কিন্তু যা বেশি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরতে হবে তাহলো, বিদ্যমান রাষ্ট্র-ব্যবস্থা ও তার মালিক যে শাসকশ্রেণি তাকে উচ্ছেদ করার কোনো কর্মসূচি নেতৃত্বে আসেনি, বরং জনগণের আন্দোলন-অভ্যুত্থানের সুযোগ নিয়ে শাসকশ্রেণিরই ভিন্ন গোষ্ঠীগুলো ক্ষমতা দখল করেছে। এজন্য তারা ষড়যন্ত্র করেছে, জনগণের সাথে বিপ্লবের নামে প্রতারণা করেছে।

বিপ্লবী কর্মসূচি আসতে হলে তার একটি আদর্শ প্রয়োজন। বিপ্লবের আদর্শ ও বিজ্ঞান হলো মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ। এই মতাদর্শের দ্বারা সজ্জিত না থাকায় জনগণের বহুবিধ সংগ্রামের নেতৃত্ব চলে গিয়েছে সাম্রাজ্যবাদের দালাল বড় বুর্জোয়াদের বিভিন্ন গোষ্ঠীর হাতে। তাদের কেউ ’৭১-এর চেতনার কথা বলে ভারতের দালালী করেছে (হাসিনা-আওয়ামী লীগ), কেউবা মধ্যপন্থি উদারনৈতিকতার নামে পশ্চিমা ধরনের প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়া রাজনীতি ফেরি  করছে (বর্তমানের বিএনপি বা এনসিপি), আর কেউবা ধর্মের নামে প্রকাশ্য ফ্যাসিবাদের কথা বলছে (জামাতসহ ধর্মবাদী দল)।  

বিপ্লবী পরিবর্তন বলতে বুঝায় সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভর আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন। মাওবাদের আদর্শ ও রাজনীতির মতে আমাদের মতো সাম্রাজ্যবাদের দ্বারা নিপীড়িত দেশে তাদের দালাল আমলা-মুৎসুদ্দি (বড়) বুর্জোয়া শাসকশ্রেণির রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য প্রথমে প্রয়োজন নয়াগণতান্ত্রিক/জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব। এই বিপ্লব বড় বড় বুর্জোয়া, সাম্রাজ্যবাদ, ভারত ও আধা-সামন্ততান্ত্রিক শ্রেণিকে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ করে প্রতিষ্ঠা করবে শ্রমিক, কৃষক, দরিদ্র, এবং নিপীড়িত নারী-আদিবাসী-জনগণের রাষ্ট্রক্ষমতা। যারা তাদের নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী সমগ্র দেশ ও সমাজকে বদলে দেয়ার কর্মযজ্ঞে সামিল হবে। যা শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত ও দেশপ্রেমিক ছোটো বুর্জোয়াশ্রেণির যৌথ বিপ্লবী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এই চার শ্রেণির যৌথ একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করবে। এরপর অব্যাহতভাবে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করা এবং সারা বিশ্ব জুড়ে কমিউনিজম ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিপ্লব এগিয়ে নেবে। সমাজতন্ত্র থেকে কমিউনিজমে যাবার পথে মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব চালিয়ে যেতে হবে। যাতে নতুন নতুন পুঁজিবাদীদের মতাদর্শ-রাজনীতিকে পরাজিত করতে হবে। বিশ্ব-ব্যাপী কমিউনিজম ব্যবস্থা হলো শ্রেণিহীন-শোষণহীন এক নতুন ধরনের সমাজব্যবস্থা। একমাত্র এ পথেই শুধু আমাদের দেশের নয়, সারা বিশ্বের নিপীড়িত জনগণের মুক্তি ঘটতে পারে। 

অতীতে রাশিয়া ও চীনে এই বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল। যদিও বিপ্লবের মাঝপথে নব্য পুঁজিবাদের দালালরা ক্ষমতা দখল করে চীন-রাশিয়ায় পুনরায় পুঁজিবাদ প্রতিষ্ঠা করেছে। এই বিপ্লব স্বতঃস্ফূর্তভাবে সংঘটিত হয়নি, হওয়া সম্ভবও নয়। মা-লে-মাবাদী আদর্শ অনুসারে এটি হয়েছে সর্বহারা শ্রেণির অগ্রসর অংশের নেতৃত্বে, সত্যিকার বিপ্লবী পার্টির নেতৃত্বে। 

 

আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা হচ্ছে নয়া-উপনিবেশিক আধা-সামন্ততান্ত্রিক। ছোট দেশ, সমতল ভূমি, ঘন বসতি, বিপুল জনসংখ্যা, অর্থনীতি ভাষা ও সংস্কৃতির প্রায় সমবিকাশ, এবং সর্বোপরি বিগত বহু দশকে আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় বহু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন– ইত্যাদি কারণে চীন বা রাশিয়ার মতো হুবহু মডেলে বিপ্লব হবে না। কিন্তু মা-লে-মাবাদী মতাদর্শ-রাজনীতির ভিত্তিতে শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে গ্রামাঞ্চলে কৃষকের দীর্ঘস্থায়ী বিপ্লবী সংগ্রামকে কেন্দ্রবিন্দু করেই সারাদেশ জুড়ে বিপ্লবী সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে। কারণ, কৃষকের সমস্যাই হলো এদেশে সবচেয়ে মৌলিক সমস্যা। যাকে কর্মসূচি আকারে তুলে ধরতে পারে শ্রমিক শ্রেণি, তার মতাদর্শ মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদের সাহায্যে। তাহলেই কৃষকের, শ্রমিকের, নিপীড়িত নারীর, আদিবাসীর ও সংগ্রামী ছাত্র-তরুণদের সত্যিকার মুক্তির কর্মসূচি সামনে আসবে। তার ফলে বুর্জোয়ারা, যারা সাম্রাজ্যবাদের দালাল, তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না নিজেদের প্রতারণামূলক কর্মসূচি চাপিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করা।

যারা মাওবাদকে স্বীকার করে না তারা মুখে শহরে গণ-অভ্যুত্থানের কথা বলে থাকে। কিন্তু কার্যত তারা বিগত পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে সে রকম কোনো অভ্যুত্থানের কোনো দৃষ্টান্ত দেখাতে পারেনি। বাস্তবে তার লক্ষ্যে তারা কোনো কাজও করেনি। বরং তারা বুর্জোয়া রাজনীতিরই লেজুড় হিসেবে কাজ করেছে। অবস্থাটা এমন হয়েছে যে, বিপ্লবী সংগ্রাম দূরের কথা, তারা এমনকি শ্রমিক-কৃষকের স্বার্থে সংস্কারমূলক সংগ্রামও তেমন একটা করছে না। এ থেকে দেখা যায় যে, তাদের তথাকথিত গণঅভ্যুত্থানের রাজনীতির মূল বিষয় হলো নিপীড়িত জনগণকে তাদের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের রাজনীতি থেকে দূরে রাখা। 

এর উৎস নিহিত রয়েছে তাদের মতাদর্শিক-রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে। যা কিনা সমাজতন্ত্রের আদর্শ ও রাজনীতির বিপ্লবী সারবস্তুকে ছাঁটাই করে দেয়। আমাদের দেশ কৃষিপ্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও গ্রামকে ও কৃষককে তারা গুরুত্ব দেয় না। কারণ, তারা মাওবাদকে ধারণ করে না, প্রকারান্তরে তাকে বিরোধিতা করে। তারা বিপ্লবের জন্য জনগণের দিক থেকে বলপ্রয়োগের ও জনগণের সশস্ত্র শক্তির প্রয়োজনীয়তাকে উপেক্ষা করে। এর মধ্য দিয়ে তারা জনগণকে বলহীন করে দেয়। ফলে আন্দোলন ও অভ্যুত্থানের ফল চলে যায় বুর্জোয়াদের হাতে, আর তারা নিজেরা বিপ্লবের বদলে সংস্কারের কানাগলিতে আটকা পড়ে। এদেশের সংসদীয় বামেরা এভাবেই বুর্জোয়াদের লেজুড়বৃত্তি করছে। 

তাই দেশের শ্রমিক-কৃষক-আদিবাসী-নারীসহ নিপীড়িত জাতি ও জনতাকে মাওবাদের আদর্শ-রাজনীতিকে ভিত্তি করেই গ্রামে-শহরে শ্রমিক-কৃষকের ব্যাপক বিপ্লবী কর্মসূচির ভিত্তিতে সংগঠিত হতে হবে। 

ছাত্র-তরুণদের আত্মপ্রতিষ্ঠার মোহ ত্যাগ করে শ্রমিক-কৃষকের সাথে একাত্ম ও বিপ্লবী মতাদর্শে সজ্জিত হয়ে বিপ্লব সম্পন্ন করার দিকে এগিয়ে আসতে হবে। অতীত ও ’২৪-এর অভ্যুত্থান পরবর্তী ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে ছাত্র-তরুণ-জনতাকে মাওবাদের লাল পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরেই সমাজ পরিবর্তনের বিপ্লবী সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

আরও খবর
 
শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র